ভারতের প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (RAW বা ‘র’)-এর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুপারিশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম (USCIRF)। সম্প্রতি প্রকাশিত কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো, বিশেষ করে ‘র’, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছে এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কী রয়েছে প্রতিবেদনে?
USCIRF-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
“ভারতের ‘র’ এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দেশের ভেতরে এবং বাইরের মুসলিম, খ্রিস্টান ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে নিপীড়ন চালিয়েছে।”
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে,
“ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিশেষ করে পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে ভারতের সমালোচকদের বিরুদ্ধে গোপন অভিযানের মাধ্যমে হুমকি ও সহিংসতা চালিয়েছে। এমনকি অভিবাসী ভারতীয় মুসলিম সম্প্রদায়ও এই টার্গেটিং-এর শিকার হয়েছে।”
নিষেধাজ্ঞার সুপারিশের কারণ
কমিশনের সুপারিশে বলা হয়েছে যে, র-এর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্রের আইন, বিশেষ করে গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কি অ্যাক্ট অনুযায়ী তাদের সম্পদ জব্দ ও ভিসা নিষিদ্ধ করা উচিত।
কমিশনের ভাইস-চেয়ার নাদিন মায়েনজা বলেন,
“ভারতীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় নিপীড়নমূলক নীতি এবং বহির্বিশ্বে সমালোচকদের টার্গেট করার প্রমাণ রয়েছে। এই ধরনের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড লঙ্ঘন করে।”
বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ
প্রতিবেদনে কাশ্মীর ইস্যু, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA), এবং দিল্লির সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-র মতো ঘটনাগুলো তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার ও নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া, ভারতের বাইরে থাকা কট্টরপন্থী শিখ নেতাদের হত্যা ও নিপীড়ন নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোও প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে।
ভারতের প্রতিক্রিয়া
ভারত এই প্রতিবেদনকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি বলেন,
“ভারত একটি সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যেখানে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের পূর্ণ নিশ্চয়তা রয়েছে। USCIRF-এর এই প্রতিবেদন বাস্তবতার সঙ্গে মিল নেই এবং এটি অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল।”
ভারতের গোয়েন্দা মহলেও এই সুপারিশ নিয়ে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। সাবেক ‘র’ প্রধান বিক্রম সুদ বলেন,
“এই ধরনের সুপারিশ ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোকে দুর্বল করার একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা। ভারত তার সুরক্ষা রক্ষায় সর্বদা সজাগ।”
যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের প্রতিক্রিয়া
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর এই সুপারিশ পর্যালোচনা করছে বলে জানা গেছে। তবে, হোয়াইট হাউস বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
বিশ্লেষকদের মতামত
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন,
“এই সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে ভারত-মার্কিন কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়তে পারে। বিশেষ করে কৌশলগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে যা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।”
পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে?
USCIRF-এর সুপারিশ সরাসরি নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নয়। মার্কিন প্রশাসন এই সুপারিশ পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন,
“ভারতের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে, এটি যুক্তরাষ্ট্র-ভারত কৌশলগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় অস্থিরতা সৃষ্টি করবে।”
